Breaking News
Home / অন্যান্য / তবুও তোমায় ভালোবাসি

তবুও তোমায় ভালোবাসি

 শাহীন আলম লিটন :
রোজাকে সে ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসতাম। কিন্তু রোজাদের পরিবার আমাদের দুই পুরুষের শত্রু। দাদার ভাইয়ের নাতনি রোজা। দাদা আর দাদার ভাইয়ের ঝগড়ার কারনে এই শত্রুতার শুরু। তবুও আমি চুুপি চুপি রোজাকে দেখতে যেতাম। চারটা বাড়ি পেরুলেই ছোট মাটির ঢিবি। সেখানে গেলেই দেখা যেত আমার রোজাকে। সবে প্রাইমারী পাশ করেছি। খেলার মাঠে খেলার ছলে কথা না বলে তো আর থাকা যায় না। তবুও যদি কেউ লুকিয়ে আমাদের বাড়ি বলে দিত তখন বাড়ি থেকে লাঠি নিয়ে তাড়া করত আমাকে পিটুনি দেয়ার জন্য। তবুও আমি কথা বলা ছাড়িনি।
একদিন আমি আমাদের গাছের গাছপাকা আম নিয়ে গিয়েছিলাম লুকিয়ে, রোজাকে দেব বলে। সেদিন রোজা আমটি হাতে নিয়েও কী মনে করে যেন ফেরত দিয়ে দিল। আর আমাকে বলে দিল, “আমার বকুল ফুল খুব পছন্দ, আমাকে এনে দিবে?” আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে সাথে সাথে বলে দিলাম, অবশ্যই এনে দেব।
রাতে আমার তেমন ঘুম হয়নি ঘুম না ভাঙ্গার ভয়ে। ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠে বকুল ফুল কুঁড়াতে যেতে হবে। একটু পর পর ঘুমানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি আমি। বারবার চোখে কল্পনা সাজাইতাম, ‘ফুল দিয়ে দিয়ে রোজাকে আমার প্রেমে ফেলব।’
কিশোর বয়সে সে রাতটি আমাকে জাগতেই হল। ভোরের আলো ফোটতেই আমি মেম্বারদের বাড়ি ছুটলাম। ওদের বাগানে বেল গাছের কাটাসহ ডাল দিয়ে বেড়া দেয়া। অতি সাবধানে কাটা পার হতে গিয়েও কাটার আঁচড়ে ফোটা রক্তে রক্তাক্ত হয়েছে শরীরের কিছু অংশ। ভিতরে ঢুকে ফুল কুঁড়িয়ে লুঙ্গিতে জমা করেছি। মেম্বারের বাবা খুব রাগী। তিনি মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে ফেরার আগেই পালাতে হবে। আসার পথে আবারো পিঠে কাটার খুঁচা লেগেছিল।
ছোট মাটির ঢিবির এখানে একটা নারকেল গাছ আছে। দেখলে মনে হবে মাটিকে আলিঙ্গন করে শুয়ে আছে গাছটি। রোজাকে ফুলগুলো দেবার পর সে বাড়ি থেকে সুই সূতো নিয়ে এল মালা গাঁথার জন্য। নারকেল গাছে বসে পা ঝুলিয়ে দিয়ে রোজা মালা গাঁথায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর গুন গুন করে কী যেন গাইছিল। এই সুর আগে কখনো শুনেছি বলে মনে হয় না। ফুল পাবার পর থেকে আমার দিকে একবার ফিরেও তাকায়নি। তবুও আমি অপলক দৃষ্টিতে রোজা এর দিকে তাকিয়ে আছি।
আমি প্রায় প্রতিদিন রোজার  জন্য ভোর সকালে উঠে বকুল ফুল কুঁড়াতে যেতাম। রোজা সে ফুলে মালা গেঁথে গলায় আর হাতে দিয়ে সারা এলাকা ঘুরে বেড়াত। সেই কিশোর বয়সে আমি রোজাকে ভালোবাসি বলেছিলাম। প্রতিউত্তরে রোজাই বলেছিল, “আমি তোমাকে না, তোমার ফুলগুলোকে ভালোবাসি।” সেদিন কষ্ট পাইনি। কেন যেন কষ্ট পাইনি। তবে মনে হয় খুব বেশি কষ্ট পাবার কথা ছিল। মন খারাপ করে দুই চার ফোটা চোখের জল ফেলারও হয়তো কথা ছিল। কিন্তু আমি এর কিছুই করিনি, মনও খারাপ হয়নি।
রোজার শেষ কথাটা ভালো লেগেছিল। তোমার সাথে কথা বলি সেটা জানতে পারলেই পিটুনি দেয়। ফুল নেই এটা জানলে মেরেই ফেলবে। আর তুমি কিসব বলছো। আমলা সদরপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় আর বালিকা বিদ্যালয় রাস্তার এপারে আর ওপারে। আমি মধ্য পথে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতাম। রোজা আসলে দুজন একসাথে স্কুলে যেতাম। আবার ফিরে আসার পথে বাড়ির কাছে আসতেই কেউ দেখার আগে দুজন আলাদা হয়ে যেতাম।
একদিন রোজার বড় চাচা আমাদের দেখে ফেলে। কিছু বলেনি তখন। কিন্তু পরের দিন আর রোজাকে পাইনি। খুব মনে আছে সেদিন মধ্যপথে রোজার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমার আর স্কুলে যাওয়া হয়নি। ছুটে এসেছি বাড়ির কাছে ছোট মাটির ঢিবির কাছে। না, সেখানেও আসেনি রোজা। রোজার কোন অসুখ করেনি তো? সন্ধার একটু আগে এসেছে রোজা। আমি নারকেল গাছে গালে হাত দিয়ে বসে ছিলাম। হঠাৎ রোজাকে দেখে অভিমান নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছি। আমি ভেবেছিলাম রোজা এসে বলবে, মন খারাপ করোনা। আজ স্কুলে যেতে ইচ্ছে করেনি। তুমি নিশ্চয় অনেকক্ষন দাড়িয়ে ছিলে, তাই না ?
এমন কিছুই বলতে না দেখে আমি তাকিয়ে দেখি রোজা হাতের উল্টো পৃষ্টে চোখের পানি মুছে। বিচলিত হয়ে জানতে চেয়েছিলাম, কী হয়েছে রোজা ? বকুুল আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিবে। মামা ঢাকায় থাকে। সেখানে থেকে পড়তে হবে। কিছু সময় নিশ্চুপ ছিলাম। কী বলা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। আমি কিছু না বলে মাথা নিচের দিকে দিয়ে বাড়ির পথ ধরেছি। এমনটা না হলেও পারত। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল দুই দাদুর পরিবার যেন একসাথে হাসিখুশিতে থাকে। রোজাও খুব করে চাইতো, আমার সাথে দেখলে তাকে যেন কেউ না বকে। এমনটা না হলেও পারত।
চারদিন পর রোজা ঢাকা চলে যাবার পর থেকে আমি মাটির ছোট ঢিবির কাছে নারিকেল গাছে বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল এই বুঝি রোজা এসে পেছন খেকে টোকা দিবে। কিন্তু আর আসেনি। ছয় মাস পর পর যখন রোজা বাড়ি আসত সেদিন আমার স্কুল যাওয়া হত না। রোজা আসার পরদিন ভোরে আমি বকুল ফুল কুঁড়িয়ে রাখতাম। ছোট মাটির ঢিবির কাছে সেই নারকেল গাছে বসে থাকতাম। প্রথম দুই বছর আসত, দেখা করত, কথা বলত। কিন্তু হঠাৎ করে আর বাড়ি আসে না রোজা। বুঝতে পারলাম আমাদের এস এস সি পরীক্ষা, সেজন্য পড়ায় ব্যস্ত।
শুনেছি রোজা এস এস সি পাশ করে ঢাকা নামকরা কলেজে ভর্তি হয়েছে। আমি রয়ে গেলাম কুষ্টিয়া  সরকারী কলেজে। যখন আড়াই তিন বছর পর রোজার বাড়ি আসার কথা শুনলাম সেদিন সন্ধে ছিল। আমি পরদিন ভোরে বকুল ফুল কুঁড়াতে গিয়েছি। কিন্তু বকুল ফুল খুঁজে পাইনি। মৌসুম ছাড়া আমার জন্যতো আর ফুল ফোটবে না। মেম্বার সকালে বের হয়ে দেখে আমি বকুল গাছের নিচে কি যেন খুঁজতেছি। কাছে আসাতে আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। এত বড় ছেলে বকুল ফুল কুঁড়াতে এসেছে তাও আবার মৌসুম ছাড়া।
মেম্বার একটা কথা বলে গেল, “তোর নামের স্বার্থকতা তুই নিজেই। বকুল ফুল না পেয়ে কচুরিপানা ফুল এনেছি বুক অবধি পানিতে নেমে। রোজার দ্বিতীয় পছন্দ কচুরিপানা ফুল। ইচ্ছে করেই আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভালো করে দেখে নিলাম। নতুর টিশার্টটি গায়ে দিয়ে কচুরিপানা ফুল নিয়ে ছোট মাটির ঢিবির কাছে ফুল নিয়ে বসে আসি। রোজা এর আসার খবর নেই। এক সময় টিনের চালে ঢিল দিয়ে দৌড়ে চলে এলাম। এমনটা আগেও করেছি। এতে করে রোজা বুঝবে আমি এখানে আছি। কিন্তু তবুও রোজা এল না। রোজা কি ইচ্ছে করে এমনটা করছে ? একসময় দেখি কার সাথে যেন ফোনে কথা বলতে বলতে বাড়ির বাইরে এসেছে। আমি হাত ইশারায় ঢাকছি। দুই তিনবার দেখার পর রোজা এল।
কচুরিপানা ফুল এগিয়ে দিয়ে বলছি, “বকুল ফুল পেলাম না। তাই বুক সমান পানি থেকে এই ফুল এনেছি।-বকুল ভাই আপনি এখনো সেই বোকাই রয়ে গেলেন। এখনো সেই ছোটকালেই পড়ে আছেন। এবার একটু বড় হোন ভাই, বুঝতে শিখুন। আসি ভাই, আপনাদের বাড়ি বা আমাদের বাড়ির কেউ দেখলে দুজনেরই সমস্যা। ভালো থাকবেন। কচুরিপানা ফুলের পাঁপড়িগুলো বসে বসে ছিঁড়ছি। আমি সত্যিই সেই বোকাই রয়ে গেলাম। গাল বেঁয়ে চোখের পানি নামার আগে আমি আটকে দিয়েছি হাত দিয়ে। কেউ দেখে ফেললে লজ্জায় পড়তে হবে। এমনটা না হলেও পারত, অন্য রকম হতে পারত। পাশেই ছোট একটি মেয়ে আরেকটি ছেলেকে বলছে, “আমি তোর সাথে আর চলতাম না, আম্মু না করছে। আর ছেলেটি বলছিল, তোর সাথে চলি সেজন্য আব্বা গতকালও পিটাইছে, তবুওতো আমি তোর সাথে চলি। দীর্ঘশ্বাস! হায়! আজ আমি কই আর রোজা কই? শুনেছি, ঢাকায় অসংখ্য মানুষ বাস করে। হয়তো তাদের ভিরে আমার রোজাও ঢাকা পরেছে। হয়তো ঢাকার কোন ছাদে বসে একটা বাচ্চা কোলে নিয়ে চাঁদ দেখাচ্ছে আর ঘুম পাড়ানির গান শুনাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে আমিও যেন চাঁদ দেখছি। সে চাঁদ নোনা জলে আঁকা… দীর্ঘশ্বাস !
SK Computer, Godagari, Rajshahi. 01721031894

About জনতার কথা ডেস্ক

Check Also

সারাদেশে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা কেন

সোহেল রানা চাঁপাইনবাবগ জেলা সংবাদ দাতা : কথায় আছে মানুষ নাকি বাঁচার জন্য ভাসমান খড়কুটোও …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *