Breaking News
Home / সম্পাদকীয় / প্রকৃতির প্রচ্ছন্ন শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা

প্রকৃতির প্রচ্ছন্ন শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা

সকালের কোলাহলহীন উন্মুক্ত পথে উদার আকাশের নিচে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ পেরিয়ে দূর্বাঘাসে জমে থাকা কণা-কণা শিশির বিন্দুর উপর সোনা ঝরা মিষ্টি রোদ; সাথে পরিশুদ্ধ বিশুদ্ধ বাতাসের পরশ যেন প্রকৃতিকে পরিণত করে সুগদ্ধ সতেজ সুনির্মল প্রকৃতিতে। সম্মোহনী এ প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য মনে জাগায় এক অব্যাখ্যাত রোমান্সকর আনন্দের অনুভূতি। প্রাতঃকালে যাঁরা হাঁটতে বের হোন প্রকৃতির অভূতপুর্ব এই রূপে- মোহাবিষ্ট হননি, এমন মানুষ মেলা ভার! প্রকৃতি আমাদের পরম বন্ধু; সম্পর্কটাও নিবিড়। তাইতো সকালের সোনালি রোদ্দুরের প্রিয়তম পরশমনে যে শিহরণ জাগায়, মেঘলা ও গম্ভীর সকাল তা পারে না। মানুষ পরিবেশে যা কিছু পায় তা থেকেই সে তার নিজের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে মানুষ তার জীবন ধারণের চেষ্টা করে যায় প্রতিনিয়ত।
হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির রূপ-লাবন্যে অবচেতন মনে ভাবি- কত সুন্দর ও মনোরম এই পৃথিবী! সকালের প্রকৃতি যেন শান্ত-পরিচ্ছন্ন ও নির্মল। মনে হয় স্বর্গের কোন দূতের মায়াবী ছোঁয়ার সুনিপণ কারুকার্যে শোভিত এ রূপ। পরক্ষণে ইমনের গহিনে উদিত সংশয়াকর ভাবনা হৃদয়কে শঙ্কিত করে তুলে। সৃষ্টির সেরা জীব, মানুষ গুলো সারা দিনে কী হাল-ই-না করে ছাড়বে এর! সমস্ত মর্ত্যলোক যখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন- প্রকৃতি তার বিশ্রাম বিসর্জন দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের পুনর্বিন্যাসে, একটি পরিশুদ্ধ অমলিন সকাল উপহার দেওয়ার জন্য। তবুও সামান্যতম অভিযোগ-অনুযোগ, মান-অভিমানের লেশমাত্র নেই তার আননে। এরই নাম প্রকৃতি। যা মানুষের জন্য অনুকরণীয় শিক্ষা হিসেবে নেয়া যেতে পারে।
সুতীক্ষ ধীশক্তি, সৃজনশীলতা আর অতি-ক্ষমতা মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে সৃষ্টিজগতের। তথ্য- প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে বিস্ময়কর প্রতিভার বিকাশে আধুনিক যুগের এই মানুষ,বিশ্বব্রহ্মান্ডের রহস্য বেরকরার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। একদিকে যেমন পদার্থের অনু, পরমানু, নিউক্লিয়াস চুর্ণ করে তার ভেতর থেকে শক্তি বের করে পারমানবিক অস্ত্রসহ নানা ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র বানাচ্ছে, অন্যদিকে এসবের কল্যাণকর ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন বাঁচানোর উপায়ও বের করে চলেছে সমান তালে। মানুষের অতীত ইতিহাস কিন্তু এমন ছিলনা। পৃথিবীতে আবির্ভাবের পর থেকে অসহায় মানুষ গুলো বাঁচার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে সেদিন এই প্রকৃতিকেই পেয়েছিল অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে। গুহায় আশ্রিত মানুষ গুলোর তখন বাঁচার মতো সামান্যতম উপকরণও ছিল না, মৌলিক চাহিদা তো অনেক পরের কথা! গাছের ডালে-ডালে অথবা পাথরে-পাথরে ঘর্ষণের মাধ্যমে আগুন সৃষ্টি এবং জুমচাষের মাধ্যমে জীবিকার অন্বেষের এই শিক্ষাটি মানুষ প্রকৃতি থেকেই পেয়ে ছিল সেদিন। কিন্তু অকৃতজ্ঞ এই মানুষগুলো বারবার বৈপরীত্যেই চলেছে প্রকৃতির। পরিণামে মানুষকে সামাল দিতে হয়েছে ভয়ঙ্কর মহামারিসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে, সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে করোনা ভাইরাসের কাল উদাহরণ হিসেবে আসতেই পারে।
আমাদের পৃথিবীটা বয়সে ভয়ানক বৃদ্ধ- লাখলাখ বছরের পুরনো১। বহু বছর পুর্বে যখন পৃথিবীর বুকে কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব ছিলো না, তখন থেকে আজ অব্দি চন্দ্র, সুর্য, গ্রহ ও নক্ষত্র তাদের নিজস্ব কক্ষপথে প্রদক্ষিণরত রয়েছে স্ব-মহিমায়। একই নিয়মে ফুল ফোটে, ফল পাকে, পাখি ডাকে, প্রজাপতি ওড়ে,ভ্রমরের গুঞ্জনে ঋতু যায় ঋতু আসে। সুদীর্ঘ এ পরিক্রমণে তাদের ন্যূনতম বিচূতি নেই যুগ যুগ ধরে। কারণ, মহান সৃষ্টিকর্তার নির্দেশিত নিয়মের প্রতি তারা আনুগত্যশীল। এই আনুগত্যশীলতার জন্যই মহাবিশ্বের কোথাও কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা বা বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয় না। প্রকৃতির নিকট হতে আনুগত্যের এই শিক্ষাটি আমরা গ্রহণ করতে পারি। আনুগত্যশীল একজন মানুষের পক্ষে কোন প্রকার অন্যায়, অবিচার, অবহেলা, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, অসন্তোষ ও অশ্রদ্ধার মতো কার্যকলাপ সংঘটন করা নিতান্তই অসম্ভব। তাইতো ইন্দোনেশিয়ায় শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম ধাপেই আনুগত্যের এ বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেয়া হয়২। বিষয়টি আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয় হতে পারে।
জাগতিক বিশ্বের মানব সৃষ্ট নয় এমন দৃশ্য-অদৃশ্য বিষয় এবং জীবন ও প্রাণই হলো প্রকৃতি। আর মানুষের আচরণের কাঙ্খিতও স্থায়ী পরিবর্তনই হলো শিক্ষা। এ শিক্ষা তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় শিক্ষার সম্মিলন ঘটে এক সাথে। পাঠ্য পুস্তকের মাধ্যমে তাত্ত্বিক শিক্ষা অর্জন সম্ভব হলেও প্রায়োগিক শিক্ষার জন্য প্রয়োজন প্রকৃতির সান্নিধ্য। বিখ্যাত দার্শনিক রুশো শিশুদের প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়ার মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে- ’’প্রকৃতিই হচ্ছে আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় সত্য এবং প্রকৃতিগত শিক্ষাই সুন্দর, পবিত্র এবং বিশ্বস্ত যা প্রকৃতির কাছ হতেই প্রাপ্ত হয়’’। প্রকৃতির শিক্ষাই দীর্ঘস্থায়ী ও চিরন্তন। শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব যেমন অনস্বীকার্য, তেমনই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণের বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রকৃতির মাঝে নিহিত আছে বিশাল জ্ঞান ভান্ডার। তাইতো কালজয়ী কবি, সুনির্মলবসু-প্রকৃতির শিক্ষা সম্পর্কে লিখেছেন:
আকাশ আমায় শিক্ষা দিল
উদার হতে ভাই রে,
কর্মী হবার মন্ত্র আমি
বায়ুর কাছে পাই রে
সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয়
আপন তেজে জ্বলতে
চাঁদ শিখাল হাসতে মোরে
মধুর কথা বলতে।
চার দেয়ালের একঘেয়েমি পড়াশোনার মাঝে প্রকৃতিগত শিক্ষা পাওয়াটা জরুরী। পৃথিবীর অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে বনে অথবা বাগানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে; প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের জন্য। সুইডিশ স্কুল ব্যবস্থা প্রথম দশ বছরের জন্য বাধ্যতামূলক এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও স্বাগত পরিবেশ প্রদানের জন্য বিশ্বে বিশেষ ভাবে পরিচিত।

৩।প্রকৃতি নিজেকে মেলে ধরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাইতো ঋত ুপরিবর্তনের বিচিত্রতায় প্রকৃতি সাজে নতুন-নতুন সাজে। নিজের গুণ, সৌন্দর্য, স্বভাব নিয়ে সর্বদাই আত্মবিশ্বাসী থাকে সে। প্রকৃতির এই গুণটিকে আমরা গ্রহণ করতে পারি, নিজেদের হীনম্মন্যতা কাটিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী হিসেবে নিজেকে মেলে ধরতে। শীতকালে ঘাস একদম শুকিয়ে যায়। গাছ-পালা প্রস্বেদন হ্রাস করতে অধিক পরিমাণে পাতা নিষ্ক্রমণ করে। সবুজ পাতার দুঃখে ভারী হয়ে ওঠে প্রকৃতির হৃদয়। প্রকৃতির বুকে বাজে ধুসরকর সুর। যার ফলে প্রকৃতি হয়ে ওঠে মলিন ও রুক্ষ। কিন্তু কিছু দিন পর ঠিকই বসন্তের আগমনে প্রকৃতি ফিরিয়ে আনে তার স্বরূপ। সবুজ পাতা-পল্লবে মুখরিত হয়ে উঠে প্রকৃতির অঙ্গন। মানুষের জীবনও ঠিক তাই; এ জীবনে- দুঃখ থাকে, কষ্ট থাকে, না পাওয়ার বেদনা থাকে, স্বজন হারানোর যন্ত্রণা থাকে তার পরও চোখ মেললেই উদার আকাশ, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, ঘনবাঁশ ঝাড়ের মাথায় কানা বকের ডাক, কচি লাউয়ের ডগায় ফড়িংয়ের ওড়া-উড়ি, মৌমাছির গুঞ্জণ, রোদ মেঘের লুকোচুরি-আবারও বাঁচার অনুপ্রেরণা জোগায় আমাদেরকে নতুন করে। প্রকৃতির কৃপাতেই এমনটি হয়। প্রকৃতির বদৌলতেই মানুষ আত্মসচেতনা, স্ব-নিয়ন্ত্রণ, অন্তর্নিহিত প্রেরণা, সহানুভূতি, স্বাধীনতা, বেঁচে থাকার কৌশল, ইতিবাচক মানসিক মনোভাব, আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের মতো বিশেষ গুণগুলো অর্জন করতে পারে অনায়াসে।

প্রকৃতি কেবল জ্ঞান ভান্ডারের আধারই নয়; বাঁচার অনুুপ্রেরণাও বটে। কেন না মানুষ্য সৃষ্টি শৈলী হৃদয়ে অপ্রাপ্তির ঢেকুর ছড়ায়, মনকে অতৃপ্তবাসনায় গ্রাস করে ঠেলে দেয় অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। কিন্তু প্রকৃতি সেই অতৃপ্ত মানব মনকে বশীভূত করে পরিতৃপ্তির উষ্ণ পরশের আলিঙ্গনে। প্রকৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক তাই মানুষ হিসেবে আমাদের শুভ বুদ্ধির-ইউদয়। উপোসের ফলে মানব দেহের পরিপাক ক্রিয়ার সাথে জড়িত অর্গানগুলো যে ভাবে বিশ্রামের সুযোগ পায়; করোনার প্রার্দুভাবে প্রকৃতিও আজ পেয়েছে সে সুযোগ। এই অণুুজীবটি বিশ্ববাসীকে বন্দি করে রেখেছে ঘরে, যার ফলে কার্বনডাইঅক্সাইড এর নিঃস্বরণ এবং ওজন স্তরের ক্ষয়হ্রাস পেতে শুরু করেছে। বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, শব্দ দূষণের সাথে জড়িত দূষকগুলোর নির্গমণও হ্রাস পাচ্ছে একই ভাবে। বিশ্ব প্রকৃতি আজ সুযোগ পেয়েছে নিজেকে মেলে ধরার। আমরা যদি সত্যি সত্যিই প্রকৃতির নিকট অধরা-ই থেকে যাই, তা হলে প্রকৃতির এমন সুযোগ মানব জাতির জন্য কখনোই কল্যাণ বয়ে আনবে না। সুতরাং প্রকৃতির শিক্ষায় অনুরণিত হয়ে; প্রকৃতির মাঝে-প্রকৃতির পাশে-প্রকৃতিকে নিয়ে-প্রকৃতির সাথে পথচলা- এই হোক আমাদের আগামির অঙ্গীকার।।

SK Computer, Godagari, Rajshahi. 01721031894

About জনতার কথা ডেস্ক

Check Also

কুষ্টিয়ায় মামুনুল হক’কে নিয়ে আ’লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ২৫

শাহীন আলম লিটন, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হেফাজত নেতা মামুনুল হককে নিয়ে পোস্ট …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *