Breaking News
Home / অন্যান্য / একজন তেলচোরের উপকথা

একজন তেলচোরের উপকথা

 লেখক -মোঃ শাহীন: এলাকার চেয়ারম্যান বল্টু  সাহেব ত্রাণের তেল নিয়ে পড়েছেন বিরাট ঝামেলায়। তার গুদামঘরে চুরি করা  দুইশত বোতল ত্রাণের  তেল রাখা।সরকার যে দুইশত পঞ্চাশ বোতল তেল বরাদ্দ দিয়েছিল- তা থেকে ৫০ বোতল  বিলি করে বাকী ২০০ বোতল  নিজের গুদামঘরে রেখেছেন।তার ইচ্ছা ছিল, করোনা গেলে সময় সুযোগ বুঝে তেল কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিবে। গেল বার সরকারি  বরাদ্দের তেল যে কোম্পানির  কাছে বিক্রি করেছিলেন এবার সেই কোম্পানির  কাছে করবেন না বলেও ঠিক করেছিলেন- হালায় একখান আস্ত চোর, চোখের সামনে তেলের বোতল  সরিয়ে গড়মিল করে,টাকা কম দেয়। তিনি সবই বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু সরকারি তেল আর উপয়ান্তর না দেখে খানিক লোকসানে  বিক্রি করেছিলেন।এটাও ভেবে রেখেছিলেন এর শোধ তিনি আরেকদিন নিবেন- পরেরবার ম্যাজিস্ট্রেট আসলে এই হালার দোকানে আগে ম্যাজিস্ট্রেট আনবো, তখন বুঝবা চোরের দশদিন আর বড় চোরের একদিন!
যাই হোক, সবকিছুই প্লান-পরিকল্পনা মতই চলতেছিল। দুইশ বোতল তেল নিয়ে তিনি খোশমেজাজে ছিলেন কিন্তু এর মাঝে হঠাৎ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় র‍্যাব-পুলিশ, এরা কথা শুনতেছে না কোথাও, সব সম্মানী ব্যাক্তি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বাড়িতে কথাবার্তা নাই উপস্থিত হয়ে বলতেছে- তেলের বোতল বের কর! বলা  মানে কাজ অর্ধেক করা শেষ। এরা কি জানে, কত কষ্টে কত টাকা  পয়সা পাবলিকরে খাওয়াইয়া চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়া লাগে! তার উপর আবার উপরের নেতারাও কথা শুনতেসে না। এমন করলে রাজনীতি চলে? এইটা তারা বোঝে!
এরই মাঝে বল্টু  চেয়ারম্যান ঠিক করেন চুরি করা ত্রাণের তেল তিনি বাড়িতে লুকিয়ে রাখবেন। প্রয়োজনবোধে তিনি সারা বছর এই তেল  ব্যবহার করবেন । এত টাকার তেল তো আর পাবলিকরে এমনিতে দেওয়া যায় না, পাবলিকও তো কম হারামি না!
বল্টু  চেয়ারম্যানের একটা পাকা বাড়ি চুরি করা ত্রাণের তেলে ভরে যায়। রাতের অন্ধকারে লোক খাটায়ে বাড়ির আসবাবপত্র বাইরে এনে তিনি ঘরে ঘরে তেলের বোতল সাজান। লোকজন যাতে বুঝতে না পারে তাই আসবাবপত্র বিক্রি করে দেবার কথা ভাবেন। অবশ্য তিনি তার বুদ্ধি খাঁটিয়ে তেলের বোতল আসবাবপত্র হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে চুরি করা তেলের বোতল একের পর এক সাজিয়ে  তার ও ছেলে-মেয়ের রুমে খাট বানিয়ে শোবার ব্যাবস্থা করেন। তেলের বোতল  দিয়ে বানান টেবিল-চেয়ার। তেলের বোতল  বিশেষ ভাবে সাজিয়ে আয়না লাগিয়ে মেয়ের জন্য তৈরি করেন ড্রেসিং টেবিল,  আরও বানান সোফা, টি-টেবিল, বুকশেলফ। নিজের বুদ্ধিমত্তায় তিনি নিজেই শিহরিত। সমস্যা খালি তেলের  গন্ধে ।
বল্টু চেয়ারম্যানের জীবন কিছু দিনেই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তেলের বোতল  বাড়িতে এনে তিনি সাগর থেকে মহাসাগরে পড়েছেন। তিনি চিৎকার করে অথৈ মহাসাগরে ভাসছেন কিন্তু কেউ শুনতে পাচ্ছে না। তার বুকের ব্যাথাটা বাড়ছে..।
বল্টু  চেয়ারম্যানের বাড়িতে খানা হয় আটজনের ২০০ বোতল তেল ছেলে-মেয়ে,  বাবা- মা, আর বউ নিয়ে কতদিনে শেষ হবে তার কোন হিসাব তিনি পান না। তার বউ-ছেলে-মেয়ে- বাবা- মা অলরেডি না জবাব দিয়ে দিয়েছে যে এই তেল  তারা খাবে না, এগুলো খেয়ে মানুষ বাঁচে! কিন্তু তেল তো শেষ করতে হবে তাই তারা কষ্ট হলেও এই তেল  আবার খায়। তবুও তো কিছুই হয়না তেলের বোতলের । বুকের ব্যাথাটা আরও বাড়ে চেয়ারম্যানের…।
বল্টু  চেয়ারম্যান এরপর বাড়িতে হুকুম জারি করে– আজ থেকে বাড়িতে কোন মাছ-তরকারি-ভাত নয় শুধু তেল খেতে হবে সকলের,  শুধুই তেল। এ বড়িতে থাকতে হলে প্রত্যেকের এক লিটার  করে  তেল খেতে হবে প্রতিবেলায়। বাড়ির সবাই তার হুকুম পালন করে। খাবার সময় হলে বউ-ছেলে-মেয়ে-বাবা-মা অশ্রুপাতে এক লিটার  করে তেল খায় প্রতিবেলায়। এত খাবার পরেও তেলের বোতল  কমে না। বুকের ব্যাথায় কুঁকড়ে ওঠেন বল্টু  সাহেব।
অন্যদিকে তেলের বোতলে ঘুমাতে ঘুমাতে চেয়ারম্যানের ছেলের গায়ে তেল চিটচিটে ভাব আর তেলের  গন্ধ হয়ে যায়। তার অনেক কষ্টে পাওয়া প্রথম গার্লফ্রেন্ড প্রথমবার হাগ দিতে গিয়ে নাক সিঁটিয়ে ফিরে আসে। বেচারা মনে অনেক দুঃখ বাড়ি ফিরে আসে। তার মাথায় এখন অন্যচিন্তা তার তুলার  মত তুলতুলে আদরের গার্লফ্রেন্ডের জন্মদিনে কি দেওয়া যায় সেটা ভাবতে থাকে। এরমাঝে চেয়ারম্যান পরিবার বিকেলের-সন্ধ্যের নাস্তা হিসেবে তেল খাওয়া শুরু করে।বল্টু  চেয়ারম্যানের বউ চুরি করা ত্রাণের তেল দিয়ে নানান রেসিপি বানাতে থাকেন। তিনি ইউটিউবে একটা চ্যানেলও খুলেন। ত্রাণের তেল দিয়ে তিনি করতে থাকেন হরেকরকম রান্না- এই যেমন, ত্রাণের তেলের মাছ ভাজা,  ত্রাণের তেলের  কোপ্তা কারি, স্যুপের রেসিপি, ত্রানের তেলের  বারবিকিউ, ত্রাণের তেলের  নুডলস, তেলের সালাদ…. ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সকল রেসিপি আবার ফেসবুকে তেলচোর বউদের সিক্রেট গ্রুপে শেয়ারও দেন নিয়মিত। তার এখন ফ্যান- ফলোয়ার অনেক।
অল্পদিন পরেই বল্টু  চেয়ারম্যানের বউয়ের পেট খারাপ হয়।পানি ছাড়া কিছু মুখে দিলেই টয়লেট চাপে।  চেয়ারম্যান বাড়ির কেউ এখন আর স্বাভাবিক মল ছাড়ে না। তারা মল ত্যাগ করতে বসলে মল  হিসেবে তেল বের হয়। হালার তেল তবুও শেষ হয় না।
বল্টু  চেয়ারম্যানের একমাত্র মেয়ের সাথে এখন কোন বান্ধবী মিশে না৷ তাঁকে সবাই ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করছে। সিক্রেট গার্লস গ্রুপেও সে আর নাই। তেমন কিছুই সে করে নাই… তার স্কুলের কিছু বান্ধবী এই করোনা যাবার পরেই তাঁদের বাসায় বেড়াতে আসে একঘেঁয়েমি দূর করতে, তারা ট্রিট চায় তার কাছে, সে সবার জন্য এক লিটার  করে তেল আনে। এই দেখেই তার বান্ধবীরা অপমানে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়… আজব তো!  এতে অপমানের কি আছে?  তেল কি মানুষ খায় না! একটু আধটু  না হয় গন্ধ……  কাটা চামচ তো দিয়েছিলাম।
অপরদিকে বল্টু  চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে প্রেমে ছ্যাঁকা খায়। ঘটনা তেমন কিছুই না। ছেলেটা তার তুলার মত তুলতুলে নরম আদরের প্রথম প্রেমিকার জন্মদিনে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো। আদরের প্রেমিকাকে দুইহাতে চোখ বন্ধ করে নিয়ে যায় গিফটের কাছে। গিফট পেপারে মোড়ানো বিশাল গিফট দেখে আদরের প্রেমিকা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে। আনন্দে গিফট পেপার খোলার পরে আবিষ্কার করে, আসলে তাঁকে দেওয়া হয়েছে  পাঁচ বোতল ত্রাণের তেল। আদরের গার্লফ্রেন্ড একটুও দেরি করেনি, গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে থাপ্পড় দিয়ে বলে-  কুত্তার বাচ্চা তোর সাথে ব্রেকাপ… আমারে আর ফোন দিবি না। সবকিছু শুনে বল্টু  চেয়ারম্যান বুকের ব্যাথায় হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে… এতকিছুর পরেও হালার তেল শেষ হয় না!
বল্টু  চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে সিদ্ধান্ত নেয় সে আত্মহত্যা করবে।যে জীবনে সে তুলার মত তুলতুলে আদুরে গার্লফ্রেন্ড হারাইছে সে জীবন রেখে কি লাভ! আত্মহত্যার আগে সে ঠিক করে এই বাড়ি ঘর সে পুড়িয়ে দিবে। সারা বাড়িঘরে সে  আগুন লাগিয়ে দেয়। দাউদাউ করে পুড়তে থাকে চেয়ারম্যান বাড়ি। ত্রাণের তেলসহ  ধরা পড়ে যাবার ভয়ে চেয়ারম্যান সাহেব খবর দেয় না ফায়ার সার্ভিসকে।বুকের ব্যাথা আর তার থামে না..।
বল্টু  চেয়ারম্যানের বাড়ির চারপাশে হাজার হাজার মানুষ। উৎসবমুখর পরিবেশ। একটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে গেছে চেয়ারম্যান বাড়িতে। আগুনে সমস্ত বাড়ি পুড়ে ধ্বংস স্তূপ হয়ে গেলেও চেয়ারম্যান বাড়িতে রাখা বোতল বোতল তেল একদম ঠিক আছে। সব কিছু ছাঁই হলেও ত্রাণের তেলের বোতল একদম অবিকল আছে, আগুনের একটু স্পর্শ সেখানে লাগে নাই।
ত্রাণের তেলের খোঁজ পেয়ে আগুনে পুড়ে যাওয়া চেয়ারম্যান বাড়িতে পুলিশ আসে। বল্টু  চেয়ারম্যানকে পুলিশ ধরে থানায় নিতে চায়৷ চেয়ারম্যান সাহেব বুকে হাত দিয়ে বাংলা সিনেমার আনোয়ার স্টাইলে হার্টঅ্যাটাক করেন। হার্ট অ্যাটাকের আগে চেয়ারম্যানকে বলতে শোনা যায়- এতকিছুর পরেও হালার তেল শেষ হলো না।
বল্টু  চেয়ারম্যান পুলিশ কাস্টডিতে হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তারেরা তার বাঁচার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। বল্টু  চেয়ারম্যান ঘোরের মধ্যে থাকেন। তার পুরো শরীর অসাড়। চারপাশ অদ্ভুত আলোতে উজ্জ্বল। সবকিছু সাদা রঙের হয়ে গেছে। তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।ফ্ল্যাশব্যাকে সারাজীবন দেখতে পাচ্ছেন তিনি৷ বল্টু  চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন তিনি মারা যাচ্ছেন… পাশে এক অদ্ভুত স্বর অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে যাচ্ছে তার পরিণামের কথা…দুইশ  বোতল তেল যাদের পাবার কথা তারা তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে  খোদা তাদের অভিযোগ শুনেছেন… দুইশ বোতল তেলের প্রতিটি ফোটা আগুনের ফুলকি হয়ে তার শরীরে ছড়িয়ে দেওয়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে। বল্টু  চেয়ারম্যান কেঁদে ওঠেন। মৃত্যুর আগে খোদার নাম নিতে যান কিন্তু তার মুখ দিয়ে বের হয়–  ‘হালার তেল তবুও শেষ হইলো না ‘।
শিক্ষার্থী- ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি।
SK Computer, Godagari, Rajshahi. 01721031894

About জনতার কথা ডেস্ক

Check Also

কুষ্টিয়ায় প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত -১

শাহীন আলম লিটন,কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে গাছের কাঠালপাড়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় ইসলাম আলী (৬২) নামে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *