Breaking News
Home / অন্যান্য / কোভিড-১৯ / আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে রোগীদের করুণ মৃত্যু

আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে রোগীদের করুণ মৃত্যু

জনতার কথা নিউজ ডেস্ক:

দেশে বর্তমানে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) সাপোর্ট না পেয়ে বেশির ভাগ রোগীর করুণ মৃত্যু ঘটছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, দেশে করোনার বাইরে প্রতিদিন সহস্রাধিক রোগীর আইসিইউয়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে আছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০টি আইসিইউ বেড। আইসিইউ যাদের প্রয়োজন তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ রোগীই মারা যায়। আবার বর্তমানে সব রোগীকে করোনা মনে করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ মুক্ত সার্টিফিকেট ছাড়া ভর্তি নিচ্ছে না অধিকাংশ হাসপাতাল। এক্ষেত্রে আইসিইউ বেড খালি থাকলেও ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না করোনা আতঙ্কে। এমন অবস্থার মধ্যে আইসিইউ যে কত প্রয়োজন তা মর্মে মর্মে বুঝছেন রোগী, অভিভাবকসহ সবমহল।

বিগত দিনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা আইসিইউ বাড়ানোর জন্য মুখে ফেনা উঠালেও কেউ কথা শোনেননি। চোর শোনে না ধর্মের কাহিনী—এমন অবস্থা। এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে, অনভিজ্ঞতা ও নিয়মনীতি না মানার কারণে স্বাস্থ্য প্রশাসন চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নীতিনির্ধারকরা এর জন্য দায়ী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাব মন্ত্রণালয় গ্রহণ করে না। অনতিবিলম্বে সব জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ চালু করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

আইসিইউতে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া হয়। উচ্চ প্রশিক্ষিত চিকিত্সক ও নার্সদের দিয়ে এটি পরিচালনা করা হয়। রোগী অনুপাতে চিকিত্সা সেবাদাতার পাশাপাশি উন্নততর যন্ত্রপাতিও থাকতে হয় এখানে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মান অনুযায়ী, হাসপাতালের মোট শয্যার ১০ শতাংশ আইসিইউ শয্যা থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তা বাস্তবায়ন হয়নি। কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ও পাবনা জেলা সদর হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোনো জেলার হাসপাতালে আইসিইউ বেড নেই। বেসরকারি ১৪ হাজার হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ৯৮ শতাংশেরই আইসিইউ নেই। এখন সর্বমহলে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কীভাবে তারা অনুমোদন পেল। বেসরকারি নামিদামি ৮/১০টি হাসপাতাল ছাড়া কোথাও আইসিইউ নেই। আইসিইউ না পেয়ে পিতার সামনে সন্তান মারা যাচ্ছে। স্বামীর সামনে স্ত্রীর মৃত্যু হচ্ছে।

ঝালকাঠি সদরের রওশন আরা বেগম (৬৫) ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স-এর সমস্যা নিয়ে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ভর্তি হন রাজধানীর ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের নয়া পল্টন শাখায়। হাসপাতালের ৫০৭ নম্বর কেবিনে আছেন তিনি। চিকিত্সা চলাকালে দুই দিন আগে রওশন আরা বেগমের নিউমোনিয়া (ফুসফুসের বাম পাশে ইনফেকশন) ধরা পড়ে। এরপর থেকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রওশন আরা বেগমের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করানোর জন্য তার স্বজনদের চাপ দিতে থাকে। রওশন আরা বেগমের ছেলে মাহমুদ রিয়াদ এ বিষয়ে ওই দিনই আইইডিসিআর-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে রোগীর নমুনা সংগ্রহের জন্য কেউ ওই হাসপাতালে যায়নি। রোগীর অভিভাবকরা আইসিইউ ব্যবস্থা রয়েছে রাজধানীর এরকম বেশ কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোনো হাসপাতালই করোনামুক্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত রোগীকে নিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়।

সম্প্রতি এক ব্যবসায়ীর মা গুলশানের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে আইসিইউতে রাখাও হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ সন্দেহে ওই রোগীকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে রাস্তায় সন্তানের কোলে মায়ের মৃত্যু হয়।

ময়মনসিংহ শহরের কালীবাড়ী রোডের বাসিন্দা প্রয়াত ব্যবসায়ী সুধাংশু বণিকের স্ত্রী আঙ্গুর বণিক (৭০) কিডনিতে পাথর হওয়ায় অপারেশনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাত্ গত রবিবার সকালে তার পেট ফুলে যায়। তার সন্তান সুজন বণিক অ্যাম্বুলেন্সে করে মাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। প্রথমে সকাল ৮টার দিকে কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হলে তারা জানায় ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে নিতে হবে। উনার বড়ো অপারেশনের প্রয়োজন। ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করতে রাজি হয়নি। কারণ, রোগীর এক্সরে করে নিউমোনিয়া জাতীয় কিছু শনাক্ত হয়। সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় পান্থপথের সেন্ট্রাল হসপিটালে। সেখানেও একই অজুহাতে ভর্তি করা হয়নি। এরপর তাকে নেওয়া হয় ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ মেডিক্যালে। রোগীর অবস্থা ততক্ষণে খারাপ হতে থাকে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ চিকিত্সা দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়। পরে বিকাল ৫টার দিকে তাকে নেওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে ভর্তির পর তার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসকরা দ্রুত আইসিইউর ব্যবস্থা করতে বলেন। তিন জন করোনা শনাক্ত হওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আইসিইউর লকডাউন অবস্থায় রয়েছে। রাতে বহু চেষ্টা করেও আইসিইউর ব্যবস্থা করা যায়নি। পরদিন সোমবার সকাল ৯টার দিকে ঐ বৃদ্ধা মৃত্যুবরণ করেন। এমন ঘটনা এখন দেশে অহরহ ঘটছে। ভুক্তভোগী এক শিশু সন্তানের বাবা জানান, আমার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য আমি পাগলের মতো আইসিইউ খুঁজেছি পুরো ঢাকা শহর। কিন্তু ফুসফুসের ইনফেকশনের কারণে কোনো হাসপাতাল রোগীকে নিতে রাজি হয়নি। সবাই বলছে, আগে কোভিড-১৯ টেস্ট করে রিপোর্ট দিতে হবে।

এনেসথেসিওলজিস্টরা বলেন, আইসিইউয়ের রোগীদের অন্য জায়গায় রাখা যাবে না। যত তাড়াতাড়ি তাদের আইসিইউতে রাখা যাবে, ততই মঙ্গল। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩২ বেড থেকে বাড়িয়ে আইসিইউ বেড করা হয়েছে ৪৮ বেডের। তারপরও সামাল দিতে পারছে না। ভর্তি রোগীদের আবেদন করে আইসিইউয়ে বেড পেতে তিন থেকে চার দিন অপেক্ষা করতে হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রত্যেকটি হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর করোনা রোগীদের ফেরত দেওয়া যাবে না। প্রত্যেকটি রোগীকে চিকিত্সা দিতে হবে। হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য পৃথক কর্নার রাখতে হবে। প্রত্যেক জেলা-উপজেলায় সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল জ্বর, সর্দি, কাশি, গলায় ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের চিকিত্সার জন্য নির্ধারণ করতে হবে। যাতে কোনো রোগী চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।

প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, আইইডিসিআরের কাছ থেকে করোনা পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া খুবই কঠিন। একটি ফলাফলের জন্য তিন থেকে চার দিন অপেক্ষা করতে হয়। আর রিপোর্টের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত চিকিত্সা শুরু হয় না। অর্থাৎ এই তিন থেকে চার দিন চিকিত্সা সেবা বঞ্চিত হয় রোগী। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। করোনা পরীক্ষা যারা করতে পারবে তাদের করার অনুমতি দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, বছরের পর বছর নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোটি কোটি টাকা আয় করছে। অথচ এই করোনা সংকটকালে তারা কোভিড-১৯ রোগীর জন্য ১০০ বা ২০০ বেড ছেড়ে দিতে পারে না? অনেকে মুখে মুখে ছেড়ে দিতে রাজি বললেও বাস্তবিক অর্থে রাজি নন। বাংলাদেশ সোসাইটি অব এনেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, আইসিইউ হলো ইমার্জেন্সি সুবিধা। যার আইসিইউ প্রয়োজন তাকে দ্রুত আইসিইউতে নিতে হবে। যত বিলম্ব হবে মৃত্যুঝুঁকি থাকবে। আর আইসিইউয়ের ডাক্তার-নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। আইসিইউয়ের জন্য আরো ৫০০ এনেসথেসিওলজিস্ট ডাক্তার নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পিপিই পরা সহজ, কিন্তু খোলা কঠিন। এদেশের অনেক ডাক্তার-নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা পিপিই খোলার নিয়ম জানেন না।

দেশে করোনায় আক্রান্ত প্রতি ১৮ জন রোগীর বিপরীতে গড়ে মাত্র একটি আইসিইউ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যা প্রয়োজনের তুলায় অপ্রতুল। সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট প্রকটভাবে দেখা দিতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইনস্টিটিউট, বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতাল মিলিয়ে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় শয্যা রয়েছে ৩১ হাজার ২৬০টি। এ হিসাবে আইসিইউ শয্যা থাকার কথা সাড়ে ৩ হাজারের বেশি। কিন্তু আছে মোট শয্যার ১ শতাংশেরও কম। এসব আইসিইউ আবার রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসতে গিয়ে সংকটপূর্ণ রোগীদের অনেকে পথে মারাও যাচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে ছুটতে হচ্ছে উচ্চ ব্যয়ের বেসরকারি হাসপাতালে।

SK Computer, Godagari, Rajshahi. 01721031894

About জনতার কথা ডেস্ক

Check Also

রামেক হাসপাতালে নতুন করে আরও ৩ জনের মৃত্যু

পাভেল ইসলাম রাজশাহী  প্রতিনিধি : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে আরও তিন জনের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *